‘মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে বলেছেন, প্রশাসনিক নির্দেশে রাজ্যপাল সরকারের মুঠোয় চলে আসবে, এভাবে কি সাংবিধানিক পদকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী ?’ বিষ্ফোরক দাবি রাজ্যপালের ।

0
13

বৃহস্পতিবার কোচবিহারের মাথাভাঙ্গা বিধানসভা কেন্দ্রের ছাটের খাটের বাড়ি এলাকায় ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের দেখতে যান রাজ্যপাল জাগদীপ ধনকড় । তারপর সেখান থেকে শীতলকুচি বিধানসভা ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসে কবলিত এলাকার মানুষদের সাথেও দেখা করেন তিনি । এদিন শীতলকুচি বিধানসভা কেন্দ্রের জোরপাটকী এলাকায় রাজ্যপালের কনভয়ে কালো পতাকা দেখান স্থানীয় মানুষজন ।

অভিযোগের তির শাসক দলের দিকে। গোটা ঘটনায় মেজাজ হারিয়ে দিনহাটায় গাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে আইসি-কে ধমক দিলেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় ।       

সড়কপথে মাথাভাঙা, শীতলকুচি, সিতাই ও দিনহাটায় এ দিন ভোট পরবর্তী হিংসার শিকার বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে দেখা করেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় । বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে দেখে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে। দেখানো হয় কালো পতাকাও। দিনহাটায় কনভয় যাওয়ার সময়েও একই রকম ছবি দেখে দৃশ্যতই মেজাজ হারান রাজ্যপাল। গাড়ি থেকে নেমে ধমক দেন আইসি-কে। ধনখড়কে বলতে শোনা যায়,”আর ইউ অ্যাওয়ার হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং হেয়ার? সেম পিপল ক্রিয়েট কেয়োস। আই নো উই উইল নট অ্যারেস্ট অ্যানিওয়ান অফ দেম।” (আপনি আদৌ বুঝতে পারছেন এখানে কী হচ্ছে? এরাই তো গোলমাল বাধায়। আমি জানি, আপনি কাউকে গ্রেফতার করবেন না।) কোচবিহারের বিজেপি সাংসদ নীশিথ প্রামাণিককে সঙ্গে নিয়ে এ দিন বিভিন্ন জায়গায় যান রাজ্যপাল। কথা বলেন মানুষের সঙ্গে। এদিন কোচবিহারে পৌঁছেই বিষ্ফোরক দাবি করে রাজ্যপাল জানান, ‘মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে বলেছেন, প্রশাসনিক নির্দেশে রাজ্যপাল সরকারের মুঠোয় চলে আসবে।’ এদিন রাজ্যপাল রাজ্য প্রশাসনকে চড়া সুরে প্রশ্ন করেন, ‘সাংবিধানিক পদকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী ?’ এমনকি এর মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন বলেও তিনি জানান । এদিন সকালে, জেলা সফরের আগে ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে রাজ্যপাল ট্যুইটে লেখেন, ‘রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রী দু’জনের পদই সাংবিধানিক । সবাই সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ । শপথের পর আপনিও সংবিধান মানতে বাধ্য । সংবিধানকে অবহেলা করা যায় না ।’ পাশাপাশি তিনি সেখানে আরও জানান, ‘খেয়াল করুন, চারটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নির্বাচন হয়েছে । কোথাও রক্তপাত হয়নি । শুধুমাত্র এখানেই হিংসার ঘটনা ঘটেছে । নিজেদের পছন্দমতো ভোট দেওয়ার মূল্য চোকাচ্ছেন মানুষ । কীভাবে এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়া যায় ? এতে কি গণতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে না ? এমনকি প্রচারে মুখ্যমন্ত্রীর উস্কানিমূলক মন্তব্যের জেরেই রাজ্যে হিংসা হয়েছে ।’ প্রসঙ্গত, রাজ্যপালের জেলা সফর নিয়ে উষ্মাপ্রকাশ করে কড়া চিঠি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, রাজ্য সরকারের অনুমতি পাওয়ার পরই, রাজ্যপালের সচিব তাঁর জেলা সফর চূড়ান্ত করবেন । সেই সফর ব্যক্তিগত হোক বা সরকারি, রাজ্যপালের সচিব সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন । অন্যদিকে রাজ্যপালকে মুখ্যমন্ত্রী যে চিঠি দিয়েছেন তাতে জানা তিনি লেখেন, ‘সোশাল মিডিয়া থেকে জানতে পারলাম, একতরফা ভাবে বৃহস্পতিবার আপনি (রাজ্যপাল) কোচবিহার ও অন্যান্য জায়গায় যাচ্ছেন । দুর্ভাগ্যজনকভাবে কয়েক দশকের প্রথা ভেঙে জেলা সফর করছেন । আমি তাই আশাকরি, আপনি রীতি মেনে চলবেন এবং এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবেন । পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্তাদের ডেকে পাঠানো নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করে তিনি লেখেন, গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে আপনাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম, যে মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভাকে এড়িয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক না করতে এবং তাদের ডেকে না পাঠাতে । আমি জানতে পেরেছি, আপনি জেনে বুঝে তা এড়িয়ে যাচ্ছেন । শুধু সরকারি কর্মীদের নির্দেশ দেওয়াই নয়, তাদের কাছ থেকে সরাসরি রিপোর্ট তলব করছেন । আপনাকে আমি অনুরোধ করছি ও পরামর্শ দিচ্ছি, এগুলো করবেন না । মুখ্যসচিবকে বলছি, নিয়ম মেনে পদক্ষেপ করতে ।’ মুখ্যমন্ত্রীর চিঠির কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের ট্যুইট করে রাজ্যপাল জানান, ‘মুখ্যমন্ত্রীর চিঠির প্রতিক্রিয়ায়, আমি তাঁকে অনুরোধ করছি, তিনি যেন যে সংবিধানকে সাক্ষী করে শপথ নিয়েছেন, সেই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি আরও একবার ভেবে দেখেন । মানুষ যে নিদারুণ দুঃখে রয়েছে, এখন সেই দুঃখ মোচনের সময় । আমি আশ্বস্ত করছি যে, আমি সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যে থেকে সমস্ত ধরনের সহযোগিতা করব ।’ এর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে প্রথা না ভাঙার যে অনুরোধ করেছিলেন, তার পাল্টা হিসাবে সংবিধানের ১৫৯ ধারার উল্লেখ করে রাজ্যপাল জানান, ‘সংবিধানের ১৫৯ ধারা অনুযায়ী আমার সম্পূর্ণ সাধ্য ও ক্ষমতা অনুযায়ী আমি সংবিধান ও আইন রক্ষা করব এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করব । আমার শপথবাক্য অনুযায়ী যা করা উচিত, আমি তার সবটাই করব ।’ একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীকে দু’পাতার চিঠি দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে ফের একবার গণতন্ত্রের লজ্জা আখ্যা দিয়ে রাজ্যপালের দাবি বারবার তাঁর সতর্কবার্তা সত্ত্বেও প্রশাসন সাংবিধানিক নিয়ম কানুন ও আইনের শাসন থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে