বাংলা সাহিত্যের জগতে নক্ষত্র পতন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৮৯ বছর বয়সে জীবনাবসান কবি শঙ্খ ঘোষের ।

0
35

করোনা কেড়ে নিল বাংলা সাহিত্যের এক নক্ষত্রকে । ৮৯ বছর বয়সে করোনা আক্রান্ত হয়ে জীবনাবসান হল কবি শঙ্খ ঘোষের । পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে গত ১২ এপ্রিল থেকে সর্দি, কাশিতে ভুগছিলেন তিনি । এরপর তাঁর করোনা পরীক্ষা করা হলে রিপোর্ট পজিটিভ আসে । কবির ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে হাসপাতালে না রেখে হোম আইসোলেশনেই চিকিৎসা চালানো হচ্ছিল । মঙ্গলবার রাতে হঠাৎই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বুধবার সকালে বাড়িতেই তাঁকে ভেন্টিলেশনে চিকিৎসা দেওয়া হয় । কিন্তু এদিন বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি চলে গেলেন । শঙ্খবাবু করোনার টিকাও নিয়েছিলেন বলেও জানা গেছে তাঁর পারিবারিক সূত্রে । পাশাপাশি শঙ্খবাবুর স্ত্রী প্রতীমাদেবীও করোনা আক্রান্ত । বর্তমানে বাড়িতেই তাঁর চিকিৎসা চলছে বলেই জানা গেছে । কবির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর বাড়িতে ফোন করে শোকজ্ঞাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান গান স্যালুট ছিল কবির অপছন্দের, তাই পরিবারের সঙ্গে কথা বলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে । যদিও নীরবে আড়ম্বরহীন শেষকৃত্য চান প্রয়াত কবির পরিবার । এদিন নিমতলা শ্মশানে নীরবেই বিদায় জানানো হয় কবিকে । ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের চাঁদপুরে জন্ম মণীন্দ্রকুমার ঘোষ ও অমলা ঘোষের সন্তান শঙ্খ ঘোষের । শঙ্খ ঘোষ নামে তিনি পরিচিত হলেও সরকারি খাতায় কলমে তাঁর নাম ছিল চিত্তপ্রিয় ঘোষ । শৈশবের কিছু পরেই স্বপরিবারে তাঁরা চলে আসেন এপার বাংলায় । প্রাথমিক লেখাপড়া পাবনায় । এরপর ১৯৫১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক হন তিনি । এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর হন । কর্মজীবনে শিক্ষকতাকেই প্রাধান্য দিয়ে তিনি প্রথমে বঙ্গবাসী কলেজ, এরপর সিটি কলেজ ও তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন । অধ্যাপক হিসাবে তার খ্যাতি এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে অধ্যাপনার জন্য তাঁর বিশ্বভারতী ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ডাক আসে । ১৯৬৭ সালে তিনি আমেরিকার আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক লেখক কর্মশালাতেও যোগ দেন । সাহিত্য জীবনে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ লিখে ধরা যাবে না। ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’, ‘মূর্খ বড় সামাজিক নয়’-এর মতো একের পর এক কাব্যগ্রন্থে তিনি বুঁদ করে রেখেছিলেন বাঙালিকে। পেয়েছেন জ্ঞানপীঠ, সাহিত্য অ্যাকাডেমি, রবীন্দ্র পুরস্কার, সরস্বতী পুরস্কার, নরসিংহ দাস পুরস্কারের মতো হাজার হাজার সম্মান। ১৯৭৭ সালে বাবরের প্রার্থনা কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান শঙ্খ ঘোষ। ‘ধূম লেগেছে হৃৎকমলে’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৮৯ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার পান তিনি। ১৯৯৯ সালে কন্নড় ভাষায় গিরিশ কারনাডের লেখা রক্তকল্যাণ নাটকটি বাংলায় অনুবাদের জন্য দ্বিতীয়বার সাহিত্য অ্যাকাডেমি সম্মান পান তিনি। ১৯৯৯ সালে দেশিকোত্তম সম্মানে ভূষিত করা হয় তাঁকে। ২০১১ সালে পান পদ্মভূষণ সম্মান। ২০১৬ সালে পান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার। শুধু কবিতা-কাব্যগ্রন্থ নয়, রবীন্দ্রনাথকেও অন্য আঙ্গিক থেকে দেখতে শিখিয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ। তাঁর মৃত্যু বাংলা সাহিত্যে যে শূন্যতা তৈরি করল এক কথায় তা অপূরণীয়। এই মৃত্যু কেবল এক রবীন্দ্রনাথ-বেত্তা, শক্তিশালীর কবির প্রয়াণ নয়, ক্ষমতা আর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বারবার জেগে ওঠা এক স্পর্ধিত মহাপ্রাণের চলে যাওয়াও বটে। শঙ্খ ঘোষের মতো মহাপ্রাণের প্রয়াণ বাঙালিকে বারবার মনে করাবে- সব মরণ নয় সমান। সত্তরের ঝোড়ো দিন থেকে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন, কখনও কোনও শাসকই তাঁর স্বরকে কিনতে পারেনি। তাঁর কলমখানি ছিল চির জাগরুক। আপাতত তিনি চললেন অনন্তের পথে। অথবা মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়, মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে-র মতো গ্রন্থে চিরায়ু হয়ে থেকে গেলেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে